ভোলায় সমাজসেবার কম্পিউটার প্রশিক্ষণ তালিকা নিয়ে ক্ষোভ; উপপরিচালক রজত শুভ্র সরকারের বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায়কে বাদ দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়কে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগ
এইচ এম হাছনাইন, ভোলা প্রতিনিধি
ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের আয়োজিত কম্পিউটার বেসিক প্রশিক্ষণের প্রকাশিত অংশগ্রহণকারীদের তালিকা নিয়ে জেলাজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের অভিযোগ তুলেছেন একাধিক আবেদনকারী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
প্রকাশিত তালিকায় ২৫ জন প্রশিক্ষণার্থীর নাম রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রায় সবাই সনাতন ধর্মাবলম্বী এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের আবেদনকারীদের বাছাই প্রক্রিয়ায় উপেক্ষা করা হয়েছে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ভোলা জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক রজত শুভ্র সরকারের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সরকারি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ধর্মীয় ভারসাম্য ও যোগ্যতার বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়েছে কি না।
মীর তানু নামক একজন সচেতন নাগরিক ফেসবুকে লিখেন, " মনে হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভগ্নিপতি যেন, ভোলা জেলা সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা হিসেবে 'প্রাইজ পোস্টিং' পেয়েছেন!
সম্প্রতি কম্পিউটার বেসিক ট্রেনিংয়ের অংশগ্রহণকারীদের যে তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে প্রায় ৯০% নামই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের। অভিযোগ উঠেছে, বেছে বেছে অনেক মুসলিম আবেদনকারীকে বাদ দেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট জেলা সমাজকল্যাণ কর্মকর্তার নাম রজত শুভ্র সরকার, যিনি নিজেও সনাতন ধর্মাবলম্বী।
যদি নিয়োগ বা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় এনে বৈষম্য করা হয়ে থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক এবং এর সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে ধর্ম নয়, যোগ্যতাই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত। "
তার ফেসবুক পোস্টের কমেন্টে অনেকে লিখেন, বাংলাদেশী বেশিরভাগ হিন্দুদেরকে বড় বড় অফিসার পোস্টে দেওয়া হয়েছে এজন্যই হিন্দু ছাড়া কোন মুসলমান চাকরি পাচ্ছে না এই হইলো বাংলাদেশের অবস্থা।
এই লিস্ট দেখে বুঝা যাচ্ছে যে ভোলায় কোন মুসলিম নাই সব হিন্দু।
বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে উপযুক্ত বিচার নিশ্চিত করা দরকার।
স্থানীয়দের দাবি, যদি প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচনে ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনায় এনে কোনো ধরনের বৈষম্য করা হয়ে থাকে, তবে বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তারা ঘটনার নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য উদঘাটন এবং প্রয়োজনে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ সম্পর্কে জেলা প্রশাসক এবং উপপরিচালক রজত শুভ্র সরকারের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য যে, এই কম্পিউটার প্রশিক্ষণ এসেছে “অনগ্রসর জনগোষ্ঠী” চা-শ্রমিক, হিজড়া, বেদে এবং সমাজের বিভিন্ন অনগ্রসর সম্প্রদায় (যেমন— জেলে, নিকারী, বৈরী, গড়, সন্ন্যাসী, পাটনী, কুশিমালি, খুমি, কায়স্থপুত্র/কাওড়া, কাহার, তাঁতী, বেহারা, পাটিকর, চৌদুলি, নরসুন্দর/নাপিত, ভোয়ার, চুনার/চুনকার, গোয়ালা, জোয়, কুমার, তেলী, হাজাম, রাউত, কুশিয়ারি, দেববর্মী, অহিমিয়া, কাইবর্ত, জলদাস, মালাকার, কানুপ্রী, কামার, নমঃশূদ্র, অলমিক, বৈকর্ত, পরবাসী, কপালিক, নায়েক, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়/পোদ, রাজবংশ, বাউড়ি, বাওয়ালী, বীন, বুনো, বুনাজ, বাঁশফোড়া, বিন্দ, ভগবানীয়া/কুড়িভাঙা, ভূঁইমাল, মাঝমাল, মালো, মৌয়াল, যুগী/নাথ, রজকধোপা/ধোপা, রাজবংশী, রানাকর্মকার, রবিদাস, লিসাম, শব্দকর, সিং, হাজারা, ইত্যাদি, হেলা, বাল্মীকি, লালবেগী, ছাপারাইতা, মাঝাইম্যা, আগারিয়া, বেলদার, কাপালী, জালো, বাহেলিয়া, কায়োরা, রাজি, বাদেওয়ারা, মাল, মাহার, মেথর, বাইতি, গুড়ি, দোহাই, সূত্রধর, মালী, কোটাল, তিওর, নাট, বাদ্যকর, কলু, নাকশী, ধুনকার, মশালচী, চর্মকার, ভৌমিক, ভগত, মাটিয়াল, গঞ্জি ইত্যাদি) অনগ্রসর জনগোষ্ঠী হিসেবে বিবেচিত হবে। এছাড়া সরকার কর্তৃক সময়ে সময়ে বাস্তবতার নিরিখে কোনো সম্প্রদায়কে অনগ্রসর ঘোষণা করা হলে তাও এ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত হবে।
এখন ভোলার সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন যে, ভোলায় কি কোন জেলে তাঁতি গাছি মাটিয়াল সম্প্রদায়ের লোক মুসলিম নয়? নাকি তারা আবেদন করার পরেও তাদের নির্বাচিত করা হয়নি? এ বিষয়টি পরিষ্কার করতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রশিক্ষণ, অনুদান বা অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে ধর্ম, বর্ণ বা রাজনৈতিক পরিচয় নয়; নির্ধারিত নীতিমালা, স্বচ্ছতা ও যোগ্যতাই একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত। তাই উদ্ভূত বিতর্ক নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ব্যাখ্যা প্রদান এবং প্রয়োজনে তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

